মেয়েরা কেন বিয়ে না করে বিদেশ যেতে পারে না?

বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় ছেলেদের পাশাপাশি সমানতালে এগিয়ে চলেছেন মেয়েরা। শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন তারা। কিন্তু অবিবাহিত মেয়েরা দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে গেলে অনেক সময়েই পরিবার থেকে শোনা যায় একটি নিষেধাজ্ঞা, “বিয়ে না করে বিদেশ যাওয়া যাবে না।“

অনেককেই এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, কেউ কেউ এমন পরিস্থিতি দেখেছেন নিজের পরিবার বা বন্ধুদের মাঝে। এই ব্যাপারটা নিয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষের এই মতামত তুলে ধরা হলো আজ-

১) দীপান্বিতা, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ম্যানেজার, নিউজিল্যান্ড

আমার এই সমস্যা ফেস করতে হয়েছে। কিন্তু আমি নিউজিল্যান্ডে এসেছি আজ ২ বছরের ওপর। নিজের ডিটারমিনেশন যদি থাকে আজ হোক কাল হোক বিদেশ যাওয়া যায়। আমি ১০ বছর জেদ করে তারপর এসেছি। হ্যাঁ, পরিবার থেকে অনেক শুনতে হয় আমি অবিবাহিত হয়ে কেন একলা বাইরে এসেছি তাও যেখানে কোনো আত্মীয় নেই। কিন্তু আমার বাবা-মা আমাকে নিয়ে গর্ব করে কারণ তারা জানে আমি নিজেই এটা করতে পারব। তাই আপুদেরকে বলবো লক্ষ্য আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞা থাকলে বাবা-মাকে যুক্তি দিয়ে বোঝাও, তুমিও পারবে।

২) আফরোজা সুলতানা, গৃহিণী, মিরপুর, ঢাকা

আমার মনে হয় এদেশের ধর্মীয় রীতি অনেকটা দায়ী। আর অনেক বাবা-মা’ই চায় মেয়ের লাইফটা সিকিউর থাকুক। বাইরের অজানা দেশে পাঠাতে অনেকটা ভয় কাজ করে। জলদি বিয়ে দিয়ে নাতি নাতনি দেখারও একটা ব্যাপার থাকে।

৩) নাজনীন রহমান, শিক্ষার্থী, বসুন্ধরা, ঢাকা

আমার মনে হয় আমাদের দেশের রক্ষণশীল কালচার অনেকটা দায়ী। যেহেতু বেশিরভাগ বাবা-মা মেয়েকে একা কোথাও ছাড়তে সিকিউরিটির কথা চিন্তা করেন সেখানে বিদেশে একা মেয়ে কীভাবে ম্যানেজ করবে এই ভয়টা পায়। বাবা-মা মেয়েদেরকে একটা গন্ডির মাঝে বড় করে। ছোট থেকেও অজানা জায়গা বলেন আর নতুন কোনো স্টেপ নেবার কথা বলেন, মেয়ের বেলায় বাবা-মা, আত্মীয়দের কনসার্ন বেশি থাকে। হঠাৎ কোনো মানুষ ফ্রিডম পেলেও ভুল কিছু করতে পারে এই ভয়টা হয়তো কাজ করে। রক্ষণশীল কালচার থেকে হুট করে মেয়ে ফ্রিডম পেয়ে লাইফে কোনো বড় ভুল করে না বসে, এই ভয়ে বাবা-মা বিয়েকেই নিরাপত্তার একটা উপায় ভাবে। কিছু কিছু বাবা-মা হয়তো লিবেরালি চিন্তা করেন কিন্তু সমাজ এমন সব যুক্তি দাঁড়া করায়, যেমন মেয়ে এত পড়ালেখা করে করবে কি, পিএইচডি করার পর স্বামী পাবে কোথায়, এত বছর পড়লে বাচ্চা নেবার বয়স থাকবে না এসব বলে। আমরা মেয়েরা ছোট থেকেই এত নিয়মের মাঝে বড় হই যাতে আমরা নিজেরাই নেজেদের নিয়ে কনফিডেন্স পাই না। আসলেই আমরা পারব একা একটা দেশে নতুন জীবন শুরু করতে কারো সাপোর্ট ছাড়া। যে সব বাবা-মা এই কনফিডেন্স তার বাচ্চাদের দিতে পারবে তারাই পারে বিয়ে না করেও বাইরে যেতে।

৪) সাহানা আনাম খান, সার্ভিস হোল্ডার, বনশ্রী, ঢাকা

আমার মনে হয় শুধু ধর্মীয় দিক দিয়ে না সামাজিক দিক দিয়েও বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় বাবা মা চাইলেও সমাজ ও আত্মীয়দের কটু কথার ভয়ে ইচ্ছা থাকা সত্বেও যেতে দিতে চায় না, আর তার উপর মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয় তো আছেই। বিদেশ বিভুয়ে বিপদে পড়লে সাহায্য করার মত কেউ থাকবে না এরকম নানা ভাবনার কারনে বাধাগ্রস্ত হয় মেয়েরা।

৫) প্রিয়া জামান, গৃহিণী, ফার্মগেট, ঢাকা

আমার মনে হয় এবং বাস্তবে দেখা যে এই মেয়েরা ম্যাক্সিমামই স্বাধীনতার অপব্যবহার করে। বাবা মা তাদের ওপর ১০০ ভাগ বিশ্বাস করতে পারে না। আমাদের শেষের উন্নতি না হলেও নারীদের নিয়ে ভাবনা চেঞ্জ খুব বেশি লোকের হয়নি। বাবা-মা তাদের মেয়েদের নিয়ে অনেক সময় ইনসিকিওর থাকে। সমাজ ব্যবস্থা যতই বদলাক না কেন পুরুষের মধ্যে পশুত্বটা আছে। তাই মেয়েদের বিয়ে দেয়াটা সলিউশন মনে করে, যেন তার হাজব্যান্ড তাকে নিরাপদে রাখতে পারে আর সামাজিক ভাবে লোকের কথার ভয়ও করে তারা।

৭) ফারহানা চৌধুরী সিঁথি, শিক্ষার্থী, মিরপুর ১, ঢাকা

মানুষ সাধারণত চিন্তা করে মেয়েদের সবসময় নিরাপত্তার জন্য একটা গার্ডিয়ান থাকা লাগে। তারা মনে করে মেয়েরা নিজেদেরকে নিরাপদে রাখতে পারে না। মেয়ে যেহেতু বিদেশ যাবে আর বাবা-মা সাথে যেতে পারবে না, এই জন্য তারা একটা বিকল্প খুঁজে নেয়। আর এই বিকল্পটা হলো হাজব্যান্ড। আমি একবার এক বান্ধবীর মায়ের সাথে কথা বললাম। তার ছেলে অনেকদিন আগে বিদেশ গেছে কিন্তু মেয়েকে কেন যেতে দেবে না? তার কথা ছিল, ওখানে মেয়েকে নিরাপদে রাখার কেউ থাকবে না। তার মেয়ের একটা স্বামী থাকলে তার সাথে বিদেশ যেতে দিত। তিনি ভাবেন পুরুষেরা ডেঞ্জারাস, কিন্তু মেয়েকে এমন ডেঞ্জারাস একটা পুরুষের হাতে তুলে দিতে তার কোনো আপত্তি নেই। ফানি রাইট?

৮) লুৎফুন্নাহার নিবিড়, এম বি বি এস চিকিৎসক, ঢাকা

বিয়া না কইরা গেলে “ইহুদী নাসারা” গো মতন বিবাহ বহির্ভূত শারিরীক সম্পর্ক করব… আর নাইলে হয় বিলাতি নয় কুনু কাইল্যারে বিয়া করব… আস্তাগফিরুল্লাহ………….

আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, বাবা মা ভাবেন, মেয়েটার বিয়ে করার সময় হয়েছে। দীর্ঘদিনের জন্য দূরে চলে যাবার আগে বিয়ের ঝামেলা মিটে গেলে বাকী ডিগ্রি শান্তিমত করতে পারবে।

এই ছিল আমাদের আজকের আয়োজন। এমন অভিজ্ঞতা আপনাদেরও অনেকের আছে হয়তো। কমেন্ট আকারে আমাদেরকে জানাতে পারেন আপনার অভিজ্ঞতা, সাথে জানান আপনার পুরো নাম, পেশা এবং লোকেশন। সেরা কমেন্টগুলো আমরা যোগ করে দেব আমাদের এই ফিচারের সাথে!

Updated: July 15, 2019 — 4:48 pm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *